হুমায়ূন সাধু একজন পরিপূর্ণ মানুষের নাম

হুমায়ূন সাধু একজন পরিপূর্ণ মানুষের নাম

সব্যসাচী দাশ: রোজকার দিনে অসংখ্য মানুষের যেমন জন্ম হয় তেমনি মৃত্যুও.. প্রকৃতি জন্ম-মৃত্যুর এই যে সরল সমীকরণে আমাদের অভ্যস্ত করেছে এর বাইরে হয়ত কল্পনা করা মুশকিল! কাছের বা দূরের মানুষের প্রস্থান গুরুত্ব ভেদে ক্ষত তৈরি করে। কিন্তু যে মানুষ কাছেরও নয় আবার দূরেরও নয়, এমন কারও চলে যাওয়ার শূন্যতা হৃদয় ব্যাকুল করে, এমন বিয়োগব্যথা সংজ্ঞায়িত করা সত্যিই আপেক্ষিক! তেমনি একজন মানুষের সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ায় সমাজের বহু মানুষের ভেতর শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে আজকের দিনে অন্তর্জালে মানুষের অবিরাম অন্তর্ধাম অনেক বিষয় পরিষ্কার করে তোলে। ঠিক তেমনি হুমায়ুন কবির সাধুর অসুস্থতা থেকে মৃত্যু সংবাদে বহু মানুষকে ব্যথিত হতে দেখেছি, সাধারণ থেকে অসাধারণ বিশেষ সম্মান, ভালবাসা এবং আক্ষেপ প্রকাশ করেছে।

হুমায়ূন সাধু এই সমাজের নিচ থেকে উঠে আসা এক শক্তিশালী মানুষের নাম। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, বডি সেমিং এসব যার কাছে কোন বিষয় হয়ে দাঁড়ায়নি। নিজের ভেতরের ইচ্ছা, গন্তব্য তাকে সব সময় তারিত করেছে। জাগতিক সঙ্কট তাকে টলাতে পারেনি। এখানে একটু পরিচিত দরকার মনে হয়। হুমায়ুন সাধু একজন খর্বকায় মানুষ ছিলেন। জন্মে ছিলেন চট্টগ্রামে। একান্নবর্তী পরিবারের মানুষ। মায়ের সঙ্গে দেশী-বিদেশী ভাষার সিনেমা দেখতে দেখতে নিজের ভেতর স্বপ্ন তৈরি করেন একদিন সেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। জীবন চলার পথে তার মতো একজন মানুষকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখমুখি হতে হবে এটা উল্লেখ না করলেও বুঝতে কারও অসুবিধে হবে বলে মনে হয় না। একটা ছোট্ট ঘটনা না বলেই নয়। সাধু দৈহিক গঠনে একটু ছোট হওয়ায় বাবা স্কুলে পাঠাতে চাইছিলেন না। বড় বোন তাকে বিদ্যালয়ে পাঠান। কিন্তু বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। সাধুর বড় ভাই তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেই সাধুকে স্কুলে নিয়ে যান এবং প্রথম সাময়িক পরীক্ষা পর্যন্ত তাকে সুযোগ দেয়ার অনুরোধ করেন।

হুমায়ূন সাধু দ্বিতীয় শ্রেণীতে ১৩০ জন ছেলে-মেয়েকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে এই হুমায়ুন চলচ্চিত্র, নাটক এবং শিল্প স্রষ্টার স্বপ্নে ঢাকা আসেন। আগন্তুক আনকোড়া শহরে সে এবং তার স্বপ্নের মূল্যায়ন কি হতে পারে আশা করি এসব উল্লেখ করার দরকার পরবে না। আগেই বলেছি জাগতিক কোন প্রতিবন্ধকতাই তাকে আটকে রাখতে পারেনি। হুমায়ুন সাধু নিজের স্বপ্নকে বাস্তব করেছে, নাটক লিখেছে, বানিয়েছে, অভিনয় করেছে, বই লিখেছে- সবশেষ সিনেমা নির্মাণের কাছাকাছি এসে তার জীবন প্রদীপ নিভে যায়। প্রকৃতি হয়ত ঠিক করেনি! সাধুর আরও সময় দরকার ছিল, নিজের জন্য এই ব্যধিগ্রস্ত সমাজের জন্য.. অসময়ে তার প্রস্থান তাকে যারা বুঝত বা অবলোকন করত তারা কেউই মেনে নিতে পারেনি। বিশেষ করে যার হাত ধরে সাধুর শিল্পের দুনিয়ার অভিষেক সেই মানুষটি অর্থাৎ মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেনি।

সাধু সম্পর্কে তার লেখা ছোট্ট একটা অভিব্যক্তি ছিল- ‘তুই সময় দিছিলি আমাদের তৈরি হওয়ার। আমরা হয়তো তৈরিও হইছিলাম। কিন্তু মানুষ বোধ হয় কখনোই প্রিয়জনের বিদায়ের জন্য তৈরি হইতে পারে না রে, সাধু!’ সত্যিই এই মানুষটার অকাল বিদায় অনেকই মেনে নিতে পারেনি যেমনি পারেনি বর্তমান সময়ের নির্মাতা ও লেখক অনিমেষ আইচ যিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব একটা এ্যাকটিভ না থাকলেও হুমায়ুন সাধুর মৃত্যুতে শোকের বার্তা লিখতে হয়ত প্রথা ভঙ্গ করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে হুমায়ুন সাধু সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, সাধুর সঙ্গে আমার কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে তাকে চিন্তাম, বিশেষ করে ফারুকী ভাইয়ের সঙ্গে তাকে বেশি দেখেছি। ওর অভিনীত এবং পরিচালিত নাটক দেখেছি। মানুষটা আকারে ছোট হলেও ভেতরটা বিশাল বড় ছিল। শিল্প সাহিত্য সৃষ্টিতে ফাইট করে যাচ্ছিল, অসময়ে ওর চলে যাওয়া আমাকে কষ্ট দিয়েছে। ওর আত্মার শান্তি কামনা করি। হ্যাঁ, এটাই ছিল হুমায়ুন সাধু!। যে নিজের বাহ্যিক আবয়বের থেকে অনেক বিশাল ছিলেন। অফসোস সময় তাকে সময় দিল না।