সরকারি অনুদান পেতে পরিচালকের স্ট্যান্ডবাজি!

সরকারি অনুদান পেতে পরিচালকের স্ট্যান্ডবাজি!

বিনোদন প্রতিবেদক: ‘গন্তব্য’ নির্মাণ করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত পরিচালক অরণ্য পলাশ, দৈনিক ২৫০ টাকা হাজিরায় কাজ করছেন হোটেলে। সঞ্জীবন শিকদারের পথ নাটক ‘কই বলল’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নাট্যনির্মাতা অরণ্য পলাশ নির্মাণ করেন ‘গন্তব্য’ চলচ্চিত্র। এরই মধ্যে সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেয়েছে চলচ্চিত্রটি। তবে অর্থাভাবে চলচ্চিত্রটি মুক্তি দিতে পারছেন না। নিজের পেট চালাতে মিরপুরের একটি হোটেলে কাজ করছেন তিনি। গণমাধ্যমে এমন প্রতিবেদনে তোলপাড় বিনোদন অঙ্গন। স্বাভাবিক ভাবেই পাঠক এই সংবাদে ব্যথিত হয়েছেন। কিন্তু নেপথ্যের ঘটনা কী? ঠিক কোন কারণে একজন সৃজনশীল মানুষকে হঠাৎ করেই এমন একটি পেশা বেছে নিতে হলো? কারণগুলো জানতে এই প্রতিবেদক অনুসন্ধান শুরু করেন। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে অজানা অনেক গল্প।

একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, শুরুতে ‘গন্তব্য’ ছবিতে প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হন আনোয়ার আজাদ নামে একজন ব্যবসায়ী। প্রাথমিক ভাবে তিনি প্রযোজক হিসেবে ৪-৫ লক্ষ টাকা লগ্নি করেন। এরপর পরিচালককে সুবিধা মনে না হলে প্রযোজক আনোয়ার আজাদ ছবিটি থেকে সরে দাড়ান। পরবর্তীতে তার সহধর্মিণী এলিনা শাম্মী প্রযোজনার হাল ধরেন। এমনকি তার বাড়ির জায়গা বিক্রি করে এ সিনেমায় প্রযোজক হিসেবে সহযোগিতার হাত বাড়ান। অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে আসে স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব। আর এই দ্বন্দ্বের বলি ‘গন্তব্য’।

সূত্রটি আরো জানায়, তারা শূটিংয়ের আগে বিয়ের ব্যাপারটি গোপন রেখে ছবির কাজ শুরু করেন। স্বামী-স্ত্রীর বিষয়টি আড়াল করে বন্ধুত্বর পরিচয়ে সবার সামনে আসেন। এমনকি তার বন্ধুকে নিয়ে ইউটিউব স্বত্ত বিক্রির জন্য তার ঘনিষ্ট এক বন্ধুকে নিয়ে লাইভ টেকনোলজি, বঙ্গবিডির সাথে কথা বললে তারা কনটেন্ট দেখে ছবিটি নিতে অনিহা প্রকাশ করে। বিষয়টি নিয়ে বন্ধুত্বের ভাটা পরে। এমনকি অরণ্য পলাশ এলিনা শাম্মীকে শারীরিক নির্যাতন করেন। পলাশের বাসা ভাড়া ও অফিস ভাড়া এলিনার কাছ থেকে জোর করে নিত। এ রকম অমানবিক নির্যাতন মেনে না নিতে পেরে এলিনা শাম্মী তার থেকে আলাদা হয়ে যায়। দুই মাসের ব্যবধানে পরিচালক অরণ্য পলাশ ‘ক্যান্টিন বয়’ হিসেবে কাজ শুরু করেন! জানা যায়, সরকারি অনুদান পেতে পরিচালকের এ স্ট্যান্ডবাজি!

এ প্রসঙ্গে পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন বলেন, ‘অরণ্য পলাশ আমাদের পরিচালক সমিতির সহযোগী সদস্য। সে পরিচালক সমিতির হস্তক্ষেপ কামনা করলে আমরা প্রযোজক সমিতির সাথে কথা বলে অরণ্য পলাশের সমস্যাটি বিবেচনা করে দেখতাম। আমাদের সমিতির পূর্ন সদস্য সাধারণ মিটিং ও ভোটাধিকার ছাড়া সকল সুবিধায় অগ্রাতিকার। পলাশ যে বিষয়টি তুলে ধরেছে সেটি উদ্দেশ্য প্রণয়ন! যা পরিচালকদের ভাবমূতি নষ্ট করে।’

তিনি আরও বলেন, তার সমস্যা উদ্দেশ্য প্রণয়ন না হলে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া ছবিটির মুক্তির ব্যাপারে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল কিন্তু পলাশ সেটি ফিরিয়ে দেন। এবং পরিচালক এস এ হক অলিকও সহযোগী পরিচালক হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দিলেও সেটিও তিনি গ্রহণ করেননি। এছাড়াও জানা মতে আরও অনেক অফার সে পেয়েছে। কিন্তু সেগুলো নিতে অনিহা প্রকাশ করেন। তাহলে তার উদ্দেশ্য কি?

এ প্রসঙ্গে জাজ মাল্টিমিডিয়ার সিইউ আলিমুল্লাহ খোকন এর সাথে কথা বলে জানা যায়, ‘একজন পরিচালক যখন ‘ক্যান্টিন বয়’ হিসেবে কাজ করছেন গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে তখন বিষয়টি আমাদের আত্নসম্মানে লাগে। তখন আমরা তাকে ছবিটির মুক্তির ব্যাপারে সহযোগী করব বলে যোগাযোগ করি। কিন্তু তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। আমাদের কাছে এটি সুবিধা মনে হয়নি। কেননা, জাজ মাল্টিমিডিয়ার মতো এত বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে চাইলেও সেটি নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। বিষয়টি আমার কাছে সুবিধা মনে হয়নি। তাহলে তার উদ্দেশ্য কি? বিষয়টি ভাবায়।

এ প্রসঙ্গে চিত্রনায়ক ফেরদৌস বলেন, ‘এই চলচ্চিত্র প্রায় দুবছর আগে শেষ করেছি। যতদূর জানি, সব কাজ শেষে চলচ্চিত্রটি সেন্সর বোর্ডের অনুমতিও পেয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি খবরে জানতে পারি, চলচ্চিত্র তৈরি করে নিঃস্ব হয়ে পরিচালক এখন হোটেলবয়। পরে জানি, সেটি আমার অভিনীত ‘গন্তব্য’ চলচ্চিত্র। জেনে চমকে উঠি। পরিচালক যদি চলচ্চিত্রের মার্কেটিংয়ের জন্য এমন কিছু করেন, সেটা হবে তাঁর ভুল। সেখানে সবার ধারণা হবে, আমরা হয়তো তাঁকে এসব শিখিয়ে দিচ্ছি। আসলে তা নয়। মূলত পরিচালক আমার কাছে আসেন দেশের বাইরে ফেস্টিভ্যালে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের কথা বলে। এই ছবিতে আমি তেমন পারিশ্রমিক নিইনি। শুটিং থেকে শুরু করে নানান ঝামেলা হয়েছিল। শেষে এসে তেমন কিছু আমি আসলে বলতে চাই না। বরং আমরা তাঁকে এই কাজটি শেষ করতে অনেক হেল্প করেছি। এমনকি পরিচালক আমার কাছে বিভিন্ন রকমের সুযোগ-সুবিধা চাইলে আমি তাঁকে চ্যানেল আই ও বিভিন্ন রকমের বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছি। এরপর আর কিছু জানি না।’

ফেরদৌস আরো বলেন, ‘কেন তিনি (অরণ্য পলাশ) এ রকম করছেন, তা আসলে আমার জানা নেই। চলচ্চিত্রের কাজ করতে গেলে তাঁকে আটঘাট বেঁধে নামতে হয়। তিনি তা না করে কাজে নামলেন কেন? চলচ্চিত্র তো বড়লোক আর জমিদারদের কাজ। তাহলে কেন তিনি এ কাজে নামলেন? তা ছাড়া তিনি যদি আগেও অনেক কাজ করতেন, তাহলে এমন আবেগময় কথায় মানুষের কাছ থেকে নানান হেল্প পেতেন। আমার মনে হয়, তাঁর জন্য পরিচালক ও কলাকুশলীসহ চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা হেয় হচ্ছেন। আমরা চলচ্চিত্রের মানুষরা তো এমন নই। টাকার অভাবে ক্যান্টিনে কাজ করে খাব, এমন তো নয়। বিষয়টি অতি লজ্জাজনক। আমার কথা হলো—তাঁর টাকা নেই, তাহলে কেন তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে আসলেন? এ বিষয়ে আসলে আমার বলার ভাষা নেই।’

উল্লেখ্য, ‘গন্তব্য’ সিনেমার বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন চিত্রনায়ক ফেরদৌস, আইরিন, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, কাজী রাজু, আফফান মিতুলসহ অনেকে। সিনেমাটির জন্য এই শিল্পীরা নামে মাত্র পারিশ্রমিক নিয়েছেন। কেউ কেউ বিনা পারিশ্রমিকে সিনেমায় কাজ করেছেন বলেও জানা গেছে।