পূর্ণিমা থেকে রাজমণি-ভাঙছে সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র

রুহুল আমিন ভূঁইয়া: ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে ‘রাজমণি’ সিনেমা হল। বাংলা চলচ্চিত্রের হাজারও ইতিহাসের স্বাক্ষী ছিল যে প্রেক্ষাগৃহ চলমান লোকসানের অজুহাতে অবশেষে হলটি ভেঙ্গে মাল্টিপ্লেক্স করার সিদ্বান্ত নিয়েছে হল কর্তৃপক্ষ। চলচ্চিত্রের নানান প্রজন্মের ইতিহাস আর দীর্ঘ স্মৃতি হারানোর আক্ষেপ থাকলেও মানসম্মত নির্ভর প্রেক্ষাগৃহের প্রত্যাশা করছেন সিনেদর্শকরা। কাকরাইল নামটি ছাঁপিয়ে যেনও ‘রাজমণি’ সিনেমা হলটি বড় পরিচয় করেছিল ঢাকাবাসীর কাছে। ঈদ-পূজা কিংবা যে কোনো উৎসব ‘রাজমণি’ সিনেমা হলে নতুন সিনেমা উঠবে আর দর্শক ভীড় জমবে না এমনটা বিরল। ইতিহাস বলে নতুন চলচ্চিত্র হলে উঠার পর প্রেক্ষাগৃহ পূর্ন সাইনবোর্ড থাকা আঁশির দশকের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য।

রাজ্জাক-আলমগীর থেকে সালমান শাহ্-শাকিব খান। সবার চলচ্চিত্র প্রদর্শনের গৌরব দাড়িয়ে থাকা সিনেমা হল ‘রাজমণি’। কাকরাইল মোড়ের দক্ষিণ পূর্বকনের ‘রাজমণি’ ১৯৮৩ সালে চালু হয়। ঢাকাই সিনেমা নিয়ে প্রায় চল্লিশ বছর নিয়মিত বিনোদন দিয়ে গেছে হলটি। কিন্তু সিনেমার রমরমা এখন কেবলই ইতিহাস। একদিকে ভালো মানের সিনেমা সংকট অন্যদিকে হলের পরিবেশ উন্নত না করা। সব মিলে দর্শক যেনও বিমুখী হয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় ‘রাজমণি’ কর্তৃপক্ষ পুরাতন কাঠামো ভেঙ্গে বহুদল মাল্টিপ্লেক্স করার সিদ্বান্ত নিয়েছে। রাজমণি কর্তৃপক্ষর ভাষ্য এখন সিনেমা বানাতে অনেক টাকা লাগে। তাই সবাই সিনেমা হল বন্ধ করে দিচ্ছে। কারণ এখনকার সিনেমা চালিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে। হলটির সাথে যুক্ত থাকা প্রায় অর্ধশত কার্মচারীদের ভিন্ন চাকরির সুযোগ দিয়েছে ‘রাজমণি’ কর্তৃপক্ষ। তবুও কোথায় যেনও একটা চাপা কষ্ট রয়েই গেছে।

এদিকে রাজধানীর মহাখালীতে চালু হলো নতুন মাল্টিপ্লেক্স। শনিবার ( ১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছে স্টার সিনেপ্লেক্সের তৃতীয় শাখা। যেখানে দিন দিন হল কমে যাচ্ছে সেখানে নতুন সিনেপ্লেক্সে তৈরি সিনেমার জন্য সু-সংবাদ বলে অনেকেই মনে করছেন।

বাংলা সিনেমার সাথে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে হল ভেঙ্গে মাল্টিপ্লেক্স বাড়ালে সেখানে ছবি প্রদর্শনের আধুনিক পদ্ধতি বজায় রেখেই তা করতে হবে। কিন্তু সেই দাবি এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। তাই সেই দাবি রাজমণির মতো অনন্য হলগুলো বিনা বাঁধাতে ভেঙ্গে ফেলা হবে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির (২০১৯-২১) এর সংশোধীত তফসিল অনুয়ায়ি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির নবনিবার্চিত সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন উজ্জল এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা এরইমধ্যে কর্তৃপক্ষর সাথে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন বিষয়টি ভেবে দেখবেন। আমরা আশাবাদী সব কিছু বিবেচনা করে মাল্টিপ্লেক্স এর সাথে একটি সিনেপ্লেক্সেও তৈরি করবেন।’ দেশের সিনেমা হলগুলো বন্ধ হওয়া প্রসঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু।

তিনি বলেন, ‘একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সিনেমা হল। সবশেষ এই তালিকায় নাম লেখালো ফিল্মপাড়া খ্যাত কাকরাইলের ‘রাজমণি’ সিনেমা হলটি। আপনারা আন্দোলন করেছিলেন যে সিনেমা হল ভেঙ্গে শপিংমল করা হলে সেখানে যেন সিনেপ্লেক্স করা বাধ্যতামূলক করা হয়। আদৌ কি সেটি বাস্তবে রুপান্তারিত হচ্ছে? ‘আমাদের ঢাকাই চলচ্চিত্র জগতের আর একটি নক্ষত ঝড়ে পড়ল। এটি ১৯৮৩ সালে তৈরি হয়েছিল। গত সপ্তাহ থেকে হলটিতে সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ হয়ে গেছে। গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারি যে সিনেমা হল ভেঙ্গে বড় শপিংমল করা হবে। কিন্তু সেখানে মালিকপক্ষ কোনো সিনেপ্লেক্স করার পজিশনই রাখেননি। তারা বাণিজ্যিক ভবন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকাই সিনেমায় উন্নয়নের জন্য যেখানে ১৩০০ সিনেমা হল ছিল সেখানে আজকে কমে ১৪৯ এসে দাঁড়িয়েছে। এভাবে যদি দেশের সব সিনেমা হল ভেঙ্গে শুধু শপিংমল করা হয় তাহলে আমাদের সিনেমা হলের কি হবে? আমরা বিভিন্ন সময় রাজপথে আন্দোলন করে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি এবং সরকার আমাদের বার বার আশ্বাসও করেছে এই পরিকল্পনা পাশ করার সময় সিনেপ্লেক্স এর পজিশন থাকবে। সিনেপ্লেক্স না থাকলে পরিকল্পনা পাশ হবে না। কিন্তু তার ছিটে ফোটা আশ্বাসও এখানে নেই।’