হতাশা দিয়েই বছর শুরু

হতাশা দিয়েই বছর শুরু

মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ঢাকাই চলচ্চিত্রর একটি বছর। সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাটা বেশিই ভারী। দু-হাজার উনিশ শুরু হয় জয়া আহসান অভিনীত আমদানি করা ‘বিসর্জন’ মুক্তির মধ্য দিয়ে। সদ্য সমাপ্ত বছরটি চলচ্চিত্রর জন্য সুখকর ছিল না। ব্যবসায়িক বিপর্যয়ের আরও একটি বছর পার করলো ঢালিউড। গত বছর সুপারহিটের সংখ্যা কমে বেড়েছে বস্তাপচা ফ্লপ ছবির সংখ্যা। আর গেল বছর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোও ছবি নির্মাণে ছিল অনিয়মিত।

৪১ দেশীয় ছবি মুক্তির মধ্যে মাত্র শাকিব খানের ‘পাসওয়ার্ড’ ছবিটি ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছে। বরাবারের মতো গত বছরও ছিল আলোচিত নায়কের তালিকায় শাকিব খান। শুরু হলো নতুন বছর। নতুন বছরে নতুন প্রত্যয়ে বুক বেধেছেন ঢালিউড চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির মানুষেরা। কিন্তু শুরুতেই যেন হতাশ হতে হলো তাদের। কারণ ঢাকাই ছবির বছরের শুরুটাই হচ্ছে ভিনদেশি ছবি দিয়ে। গত বছরের মতো দেশের প্রেক্ষাগ্রহে নতুন বছরের শুরুটা হচ্ছে ফের জয়া আহসান অভিনীত আমদানি করা সিনেমা ‘রবিবার’ দিয়ে। আগামীকাল (৩ জানুয়ারি) সাফটা চুক্তির আওতায় আমদানি করা অতনু ঘোষ পরিচালিত ‘রবিবার’ ছবিটি মুক্তি পেতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ছবিটি মুক্তি দিচ্ছে অ্যাকশন কাট এন্টারটেইনমেন্ট।

ছবিতে জয়ার বিপরীতে অভিনয় করেছেন প্রসেনজিত। ছবির গল্প মূলত প্রেম ও আবেগের। যেখানে দেখা যাবে, এক সময় জয়া-প্রসেনজিতের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেটা ভেঙে যায়। আলাদা ভুবনে তাদের বসবাস। হঠাৎ একদিন রবিবারে তাদের দেখা হয়। এরপর ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়। এতে অভিনয় প্রসঙ্গে জয়া বলেন, ‘রবিবার’ একেবারেই আধুনিক সম্পর্কের গল্প। দুটো চরিত্র খুব স্পষ্ট কথা বলে। ভালো লাগছে বছরের শুরুতেই আমার ছবি মুক্তি পাচ্ছে। গত বছরও শুরু হয় আমার ছবি দিয়ে। এ বছরটিও শুরু হচ্ছে আমার ছবি দিয়ে। সত্যি আমি ভাগ্যবান।’

এ ব্যাপারে চিত্রনায়ক ফেরদৌস বলেন, ‘অনেক সময় শুরুটা খারাপ হলেও শেষটা ভালো হয়। অনেকেই তো বলেন, ঢাকার চলচ্চিত্রের সুদিন আসছে। আমিও তা-ই মনে করি। কারণ অনেক দিনই তো খারাপ অবস্থা যাচ্ছে। ভালো অবস্থা হয়তো তাড়াতাড়িই ফিরবে।’এরইমধ্যে অনেকেই নতুন বছরে নিজেদের কাজের ছক এঁকে নিয়েছেন। চলতি বছরটা সিনেমার বছর হবে এমনটাই ধারণা করছেন শোবিজ সংশ্লিষ্টরা। মুক্তি পেতে পারে ভালো মানের কিছু ছবি যেগুলো হয়তো ইন্ডাস্ট্রিকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিবে।

পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন বলেন, ‘২০১৯ সালে আমাদের চলচ্চিত্রর জন্য সুখকর ছিল না। হতাশা দিয়ে একটি বছর পার করতে হয়েছে। কারন ৪১ ছবির মধ্য মাত্র একটি ছবি ব্যবসা করেছে যা চলচ্চিত্র শিল্পর জন্য দু:খজনক। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই আমাদের শিল্পটি ধ্বংস হয়ে যাবে। আশা রাখছি নতুন বছরটি নতুন প্রত্যয়ে সবাই কাজ করবে। ঘুরে দাড়াবে আমাদের চলচ্চিত্র। এ বছর বড় বাজেটের ভালো কয়েকটি ছবি মুক্তি পাবে তার মধ্যে রয়েছে ‘আগুন’, ‘বীর’, ‘মিশন এক্সট্রিম’, ‘ক্রিমিনাল’(এর আগে ছবিটির নাম ছিল ‘একটু প্রেম দরকার’), ‘জ্বীন’সহ বেশ কয়েকটি ছবি। তাই আমরা আশা করছি গতবারের তুলনায় চলতি বছর সিনেমার জন্য ভালো যাবে। আর একটি বিষয় বলতে চাই যে, কেউ নিজেদের মধ্যে দল করে ভেদাভেদ তৈরি না করে সবাই মিলে চলচ্চিত্রর সুদিন ফেরাতে একত্রে কাজ করি। যাতে করে আমাদের এই শিল্পটি আরও এগিয়ে যায়।’

শিল্পী সমিতির সাধারন সম্পাদক জায়েদ খান বলেন, ‘ই-টিকিটিং সিস্টেম চালু না করলে প্রযোজক কখনোই তার লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত পাবেন না। ছবি বানানো এখন যত সহজ, মুক্তি দেয়া তার চেয়েও কঠিন। পরিবেশকদের সৃষ্ট এ জটিলতার কারণে তারা মূলত নিজের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মারছেন। তাদের আমদানি নিভর্র ছবিও এ জন্য সাফল্য পাচ্ছে না। একমাত্র ই-টিকিটিং চালু হলে এ অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে পারবে।’

কিন্তু যে সংগঠনকে বলা হয়, চলচ্চিত্রের মাদার অগার্নাইজেশন, সেই প্রযোজক সমিতি অচল হয়ে পড়ে ছিল দীর্ঘ ৭ বছর। ঢাকাই সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ এই সংগঠনটি দীর্ঘ সাত বছর ধরে নানা জটিলতায় সময় কাটিয়েছে। ছিল না কোনো কার্যক্রম বা কমিটি। সিনেমা প্রযোজনা থেকেও দূরে ছিলেন বেশির ভাগ প্রযোজক। গত ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচন ২০১৯-২১। এদিকে দীর্ঘ সাত বছর পর প্রযোজকদের এই নির্বাচনকে ঘিরে অনেকেই আশায় বুক বেঁধেছেন। স্থবিরতা কাটার সম্ভাবনাও দেখে ছিলেন।

কিন্তু নতুন নেতৃত্বে আসার ছয় মাস অতিক্রম হলেও কোনো আশার আলো দেখা যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চলচ্চিত্রর সাথে জড়িত অনেকেই বলছেন নতুন নেতৃত্বে যারা এসেছেন তারা প্রত্যেকেই একটি ছবির ঘোষণা করুক। তাহলে আমাদের সিনেমার সংখ্যা বাড়বে। হারানো সিনেমার রমরমা অবস্থা ফিরে পাবে। বিলুপ্তির পথ থেকে চলচ্চিত্র শিল্পকে ফিরিয়ে আনতে প্রযোজক সমিতিরই সবচেয়ে বড় ভূমিকা বলে মন্তব্য করেছন তারা।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল বলেন, ‘চলচ্চিত্র বাঁচাতে সরকারি উদ্যোগে হল তৈরি করতে হবে। আমাদের অনেক ভালো ভালো ছবি নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু তা দেখানোর পরিবেশ নেই। তাই চলচ্চিত্র শিল্পর উন্নয়নের জন্য সরকারি ভাবে আধুনিক সিনেমা হল নির্মাণ করতে হবে।’ সরকারি অনুদান প্রসঙ্গে যোগ করে ইকবাল আরও বলেন, ‘সাধারণত যেসব সিনেমাকে সরকারি অনুদান দেয়া হয় সেগুলো দর্শক টানতে পারে না। তবে কিছু ছবি দর্শক পছন্দ করে। কিন্তু তার সংখ্যা সীমিত। কখন কোথায় সিনেমাগুলো মুক্তি পায় কেউ জানে না। অনুদানপ্রাপ্ত সিনেমার নির্মাতারা নিজেরা নিজেরা সিনেমার প্রদর্শন করেন।

কিন্তু যেসব সিনেমা মানুষ দেখে সেগুলো সরকারি অনুদান পায় না। বিবেচনা করা যেতে পারে যে, সিনেমা নিমার্ণের জন্য সরকারি অনুদানে যে টাকা একজন প্রযোজক পান সে টাকাগুলো একত্রিত করে অনেকগুলো হল নির্মাণ করা সম্ভব। আমাদের সিনেমার সংকট নেই, রয়েছে হল সংকট। আমরা সিনেমা নির্মাণ করে সেটাকে যথাযথভাবে দর্শকদের কাছে দেব সেই জায়গাটা ঠিক নেই, এটাই আমাদের মূল সমস্যা। আগে সিনেমা চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

এতে করে নতুন নতুন প্রযোজক আসবে। হল বাঁচলে চলচ্চিত্র শিল্প বাঁচবে। আমাদের চলচ্চিত্র ভালোর দিকে যাচ্ছে। ভালো ছবি হচ্ছে না এটা বলা যাবে না। সিনেমা প্রদর্শনের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হল সঙ্কট। হল নেই, ছোট পরিসরে মানসম্মত ভাল হল তৈরি করতে হবে। দর্শক ভাল পরিবেশে সিনেমা দেখতে চায়। এজন্য সরকারি উদ্যোগে হল তৈরি করতে হবে।’